রবিবার, ১লা সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে

ভোরের সংলাপ ডট কম :
আগস্ট ৫, ২০১৭
news-image

বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সচেতনতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সিনথেটিক পণ্যের বদলে প্রাকৃতিক তন্তুজাত পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ ও চাহিদা বাড়ছে। এ কারণেই অভ্যন্তরীণ বাজার এবং বিশ্বব্যাপী পাটের ব্যবহার ও চাহিদা বৃদ্ধির যে সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে তাকে ঘিরেই বাংলাদেশি পাটের সুদিন ফিরে আসার দিন গুনছে কৃষকরা। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে দেশের পাটচাষীরা এক সময় হাল ছেড়ে দিলেও এখন তারা নতুন উদ্যমে পাটচাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। পাটের ভাল ফলনের পরও নদীনালায় পানি না থাকায় পাট পঁচানোর সুযোগ না থাকায় প্রায়শ: বিপদে পড়তে হয় কৃষকদের। তবে এবার সে ধরনের দুশ্চিন্তায় পড়তে হচ্ছেনা। গতকাল ইনকিলাবে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, দেশের মধ্য পশ্চিমাঞ্চলে এবার পাটের বাম্পার ফলন হলেও যথারীতি ন্যায্য মূল্য নিয়ে দুর্ভাবনায় রয়েছে কৃষকরা। পাটের সুদিন ফিরিয়ে এনে কৃষকের ভাগ্যবদল এবং পাটপণ্যের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। পাটের ন্যয্যমূল্য নিশ্চিত না হলে পাটের সুদিন ফিরিয়ে আনা বা পাটের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বাস্তবায়ন অসম্ভব হবে।
একসময় পাটই ছিল বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির বুনিয়াদি সম্পদ। পাট রফতানীর আয় থেকেই মূলত: দেশের বেশীরভাগ আমদানী ব্যয় নির্বাহ করা হত। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে পাটকলগুলোতে নাশকতা, শ্রমিক অসন্তোষসহ নানাবিধ কারণে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং লোকসানের মুখে সরকারী মালিকানাধীন পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে পাটের ঐতিহ্য ও বাজার হারায়। সময়ের বির্বতনে পাটের স্থান দখল করে নেয় তৈরী পোশাক শিল্প। তবে তৈরী পোশাক শিল্পের কাঁচামাল ও ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ পণ্য ব্যাপকহারে আমদানী নির্ভর হলেও, পাটশিল্পে কাঁচাপাট, পাটের সুতা এবং পাটজাত পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে তেমন বিদেশ নির্ভরতা না থাকায় এ খাতের রফতানী আয় পুরোটাই দেশের সম্পদে পরিনত হয়। পাটের বিশ্ববাজারে এখনো সিংহভাগের যোগানদাতা বাংলাদেশ। এ কারণে আন্তজার্তিক বাজারে বাংলাদেশি পাটতন্তু ও পণ্যের ব্রান্ডিং এবং মূল্য সংযোজনে বাংলাদেশকেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষত: জনস্বাস্থ্য ও পরিব্শেবান্ধব প্রাকৃতিক তন্তু হিসেবে পাটের বহুমুখী ব্যবহার সম্পর্কে ইতিবাচক প্রচারণার দায়িত্ব দেশের পাট ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোকে পালন করতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে পাট থেকে ভিসকস রেয়ন উৎপাদনের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা’ বাস্তবায়িত হলে পাটজাত পণ্যের আরেকটি দিগন্ত খুলে যেতে পারে। চীনের সহায়তায় পাট থেকে ভিসকস রেয়ন কাগজ তৈরীর পাল্প উৎপাদনের প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও বাংলাদেশি পাটের অন্যতম প্রধান ক্রেতা ভারত এন্টি ডাম্পিং ডিউটি আরোপ করে বাংলাদেশের সামগ্রিক পাটখাতকেই বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। পাট রফতানীর উপর যে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে তাতে কৃষকরা কতটা লাভবান হচ্ছে তা বিবেচনায় নিতে হবে। পাটের উৎপাদন ও রফতানীবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির গ্যারান্টি অন্যতম গুরুত্ব দাবী করে।
সব ষড়যন্ত্র ও প্রতিকূলতা অতিক্রম করে বাংলাদেশের পাটশিল্প আবারো স্বর্ণযুগে প্রবেশ করতে চলেছে বলেই আমাদের বিশ্বাস। ম্যান্ডেটরি প্যাকেজিং অ্যাক্টের আওতায় দেশিয় বাজারে পণ্যের মোড়কজাতকরণে পাটের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়া ছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পাটের চাহিদা ক্রমে বেড়ে চলেছে। বিশেষত: জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সিনথেটিক পলিথিনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী গণসচেতনতা গড়ে ওঠার সাথে সাথে পাটজাত মোড়ক ও পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। গাছ কেটে কাগজের পাল্প তৈরীর বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যবহারের উদ্যোগ সফল হলে কাঁচা পাট রফতানীর হার অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। বর্তমানে দেশের বস্ত্রখাতে বছরে প্রায় ৮০ কোটি টাকার ভিসকস রেয়ন আমদানী করতে হচ্ছে। পাট থেকে ভিসকস উৎপাদনের প্লান্ট চালু হলে এর পুরোটা দেশেই উৎপাদিত হবে বলে জানা যায়। কয়েক মাস আগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বর্তমানে বিশ্ববাজারে শুধুমাত্র পাটের পলিথিনের চাহিদা প্রায় ৫০০বিলিয়ন পিস। এ বাজারের মাত্র ১০ শতাংশ দখল করতে পারলে শুধুমাত্র একটি পাটপণ্য থেকে বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। বিশ্ববাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারলে আগামী ৫ বছরের মধ্যে পাটশিল্প তৈরী পোশাক খাতকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ প্রকাশ করছেন। বর্তমানে দেশে প্রায় ৮৫ লাখ বেল পাট উৎপাদিত হয়। পাটের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সফল হলে দেশে পাটের উৎপাদন কোটি বেল অতিক্রম করতে পারে। কাঁচা পাট রফতানীর বদলে আভ্যন্তরীণ বাজারে পাটের ব্যবহার বৃদ্ধি ও পাটপণ্যের বহুমুখীকরণের উদ্যোগগুলো দ্রæতায়িত করতে হবে। তৈরী পোশাক শিল্পসহ নানা ক্ষেত্রে পাটের ব্যবহারে উদ্ভাবনী সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পাট গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের যে সব এলাকায় পাট উৎপাদিত হয় সেখানে পাট পঁচানো ও প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রতিবন্ধকতাসমুহ দূর করার সময়োপযোগি পদক্ষেপ নিতে হবে।