রবিবার, ১লা সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

ঢাকার খাল উদ্ধার ও সংস্কার জরুরি

ভোরের সংলাপ ডট কম :
আগস্ট ৫, ২০১৭

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা পানি সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে বলেছেন, ঢাকার নতুন খাল খনন, পুরানো খাল সংস্কার এবং জলাধারগুলো সংরক্ষণে সরকার পদক্ষেপ নেবে। তার এ বক্তব্য রাজধানীবাসীর জন্য সন্দেহাতীতভাবেই একটি সুখবর। সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকা শহর তলিয়ে যায়। রাস্তায় হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি ঠাই দাঁড়িয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। চলতি বর্ষা মওসুমে দু’য়েকদিন পর পরই এই দুর্ঘট পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে দেখা যাচ্ছে। এ সময় মানুষের দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনার কোনো সীমা-পরিসীমা থাকছে না। ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সঙ্গে মারাত্মক যানজটে শহর সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ছে। রাজধানী শহরের এহেন অচলাবস্থা কোনোমতেই কাঙ্খিত হতে পারে না। বিশেষজ্ঞরা তো বটেই, সাধারণ মানুষেরও এটা আবিদিত নয় যে, ড্রেনেজ সিস্টেমের দুর্বলতা ও অপর্যাপ্ততার কারণে এ ধরনের জলাবদ্ধতা ও অচলাবস্থা দেখা দিচ্ছে। ড্রেনেজ সিস্টেম ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি কর্পোরেশন। ড্রেনেজ সিস্টেম নেটওয়ার্কের ৩৬০ কিলোমিটারের দায়িত্বে ঢাকা ওয়াসা। আর ৩০০ কিলোমিটার নেটওয়ার্কের দায়িত্বে আছে দুই সিটি কর্পোরেশন। ব¯ু‘ত, দুই কর্র্তৃপক্ষের অপারগতা ও ব্যর্থতার কারণেই এ অভাবনীয় জলাবদ্ধতার শোচনীয় শিকার হচ্ছে ঢাকাবাসী। অথচ দু’কর্তৃপক্ষের কেউই দায় স্বীকারে রাজি নয়। তারা একে অপরকে দেখারোপ করে দায় এড়াতে চাইছে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। একথা বলতেই হবে, অপরিকল্পিতভাবে শহরের সম্প্রসারণ ঘটছে। পরিকল্পিত ড্রেনেজ সিস্টেমও সেকারণে গড়ে ওঠেনি বা উঠছে না। আবার যতটুকু নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে তারও যথাযথ মেন্টেনেন্স হচ্ছে না। ময়লা-আবর্জনা, পলিথিন ও প্লাস্টিক সমগ্রী ড্রেনে পতিত হচ্ছে নির্বিচারে, যাতে ড্রেন বন্ধ বা ভরাট হয়ে পানি নিকাশের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে নাগরিক অসচেতনাও বিশেষভাবে দায়ী। প্রয়োজনীয় নাগরিক শিক্ষার অভাবে অনেকেই ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্যসামগ্রী ড্রেনে নিক্ষেপ করে নির্দিষ্ট স্থানে না ফেলে। প্রকৃতপক্ষে পরিকল্পিত ড্রেনেজ সিস্টম নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি সুচারু মেন্টেনেন্স এবং নাগরিক সচেনতা বৃদ্ধি ছাড়া জলাবদ্ধতার নিরসন সম্ভব নয়।
এ কথা ওয়াকিবহাল মহলের অজানা নেই, এক সময় এই শহরে প্রায় অর্ধশত প্রবাহমান খাল ছিল, ছিল বহু সংখ্যক জলাধার। তখন পানি নিকাশের কোনো সমস্যা ছিলনা। ড্রেনের পানিই হোক, আর বৃষ্টির পানিই হোক, এই সব প্রবাহমান খাল ও জলাধার হয়ে নদীতে পতিত হতো। ঢাকার চার পাশের নদীগুলোও তখন ছিল সচল ও স্রোতময়। তখন ঢাকা শহর ছিল ছোট; লোক সংখ্যাও ছিল কম। ফলে তা ছিল পরিচ্ছন্ন ও সৌন্দর্যময়। গত প্রায় অর্ধশতাব্দীকালে সেই অবস্থার ঘটে গেছে আমূল পরিবর্তন। প্রবহমান খালগুলোর অধিকাংশের এখন কোনো অস্তিত্ব নেই। জলাধারগুলোরও বেশিরভাগ হারিয়ে গেছে। খাল-জলাধার দখল করে, ভরাট করে ঘরবাড়ি, দোকানপাট, রাস্তাঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। নগরবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হারিয়ে যাওয়া খাল ও জলাধারগুলো উদ্ধার বা দখলমুক্ত করে সাবেক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে ঢাকা জলাবদ্ধার অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারে। ফের হয়ে উঠতে পারে বসবাসের জন্য উপযোগী। খাল উদ্ধারের ব্যাপারে এ যাবৎ অনেক কথা হয়েছে, অনেক প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, অনেক উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি, কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। এ ব্যাপারে একটা হতাশা দীর্ঘদিন ধরে বিরাজ করছে। কোন কর্তৃপক্ষ খালের মালিক, কোন কর্তৃপক্ষ তার উদ্ধার ও সংস্কার করবে, এ নিয়ে নানা বির্তক হতে দেখা গেছে। কেউই দায়িত্ব নিতে চায়নি। বাস্তবতার এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য নিরাশ আঁধারে আশার আলো সঞ্চারিত করেছে। আসলে ঢাকাকে বসবাস উপযোগী শহরে পরিণত করতে হলে জলাবদ্ধতার অবসান এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে নতুন খাল খননের কথা বলেছেন, পুরানো খাল সংস্কারের কথা বলেছেন এবং জলাধার সংরক্ষণের কথা বলেছেন। এই কাজগুলো করা এখন খুবই জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য বা ঘোষণার ত্বরিত বাস্তবায়ন দেখতে চায় ঢাকাবাসী। প্রয়োজনে নতুন খাল খনন করতে হবে। তার আগে হারিয়ে যাওয়া এবং আবর্জনার ¯ু‘পে বদ্ধ হয়ে থাকা খালগুলো উদ্ধার করতে হবে। এজন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। খাল উদ্ধারসহ ঢাকার ড্রেনেজ সিস্টেম নেটওয়ার্কের পুরো দায়িত্ব দুই সিটি কর্পোরেশনের হাতে ন্যস্ত করা যেতে পারে। হাতিরঝিল ও পূর্বাচলের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ, উদ্যোগ, নজরদারির কথা কারো অজানা নেই। তিনি যখন খাল নির্মাণ, খাল উদ্ধার ও জলাধার সংরক্ষণের কথা বলেছেন, তখন কেউ তাকে কথার কথা বলে মনে করে না।
ঢাকার খালগুলোকে পুনরুদ্ধার ও সংস্কার করা গেলে পানি নিকাশ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটবে। এই সঙ্গে ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে দখলমুক্ত, সংস্কার ও পুর্নখনন করার ব্যবস্থাও নিতে হবে। বুড়িগঙ্গা, শীতল²া তুরাগ ও বালু-এই চারটি নদী দখল ও দূষণে মৃত্যপ্রায়। এগুলোকে জীবিত করতে হবে। কার্যত এই নদী চতুষ্টয় বর্জ্যরে ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এরা নাব্যতা হারিয়েছে এবং এদের পানি ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। বিশ্বে ঢাকার মতো এমন আর একটি রাজধানী শহর খুঁজে পাওয়া যাবে যা এরকম নদীবেষ্টিত বা নদী দ্বারা সুরক্ষিত এবং যার অভ্যন্তরে একদা ছিল বহু স্রোতাস্বনী খাল ও জলাধার। চার নদীর দখল, দূষণ বন্ধে বহু উদ্যোগ ও পদক্ষেপের কথা আমরা শুনেছি। কিছু কিছু প্রকল্পও নেয়া হয়েছে। কিন্তু তাতে কোনো সুফল মেলেনি। টাকার অপচয় হয়েছে। সাতে-ভুতে টাকা মেরে খেয়েছে। এই অভিজ্ঞতা আমলে নিয়ে নদীগুলো দখল ও দূষণমুক্ত করার জন্য একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা নিতে হবে এবং তার বাস্তবায়ন ত্বরিত ও দুর্নীতি মুক্ত করতে হবে। দু:খজনক হলেও ঢাকার জলাবদ্ধতা, ড্রেনেজ সিস্টেম নেটওয়ার্ক অকর্যকর হয়ে পড়া, ময়লা-আবর্জনার ¯ু‘প হওয়া, নদীগুলোর বর্জ্যভোগাড়ে পরিণত হওয়ার পেছনে নাগরিকদেরও একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। তারা যথেষ্ট দায়িত্বশীল ও সচেতন নয়। সে কারণে নাগরিক শিক্ষা ও নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। জনপ্রতিনিধিদের এ ব্যাপারে কাজে লাগাতে হবে। এই সঙ্গে পত্রপত্রিকা ও রেডিও-টেলিভিশনের মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে যাতে কেউ যততত্র ময়লা আবর্জনা না ফেলে। যে কোনো মূল্যে ঢাকাকে বসবাস উপযোগী, পরিচ্ছন্ন এবং সৌন্দর্যময় একটি শহরে পরিণত করতে হবে।