শনিবার, ৮ই আগস্ট, ২০২০ ইং

‘গুলি করে যে’

ভোরের সংলাপ ডট কম :
জুন ২৪, ২০১৭
news-image

রুমীন ফারহানা : আমার গতিবিধি বড় সীমিত। আদালত, বাড়ি, চেম্বার, টিভি শো এর মধ্যেই আমার ঘোরাফেরা। অনলাইনের যুগ হওয়াতে কেনাকাটা যতটা পারি অনলাইনেই করার চেষ্টা করি। এতে সময় বাঁচে, ঝামেলা কমে, মার্কেটে ঘোরার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। কিন্তু এখন ঈদ বলে কথা। নিজের জন্য না হলেও পরিবার আছে। সুতরাং গিয়েছিলাম নিউমার্কেট, এক জায়গায় সেমাই থেকে শাড়ি সব পাবো এই আশায়। লোকে লোকারণ্য চারপাশ। কিছুদিন আগে পত্রিকার পাতায় দেখেছিলাম ধনী ক্রেতারা সব কলকাতামুখী, ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত। নিউমার্কেট অবশ্য সে অর্থে ধনী ক্রেতাদের জায়গা না সুতরাং ভীড় ছিল যথেষ্ট।
কাপড় পছন্দ করছি হঠাৎ এক ভদ্রমহিলা এগিয়ে এসে বললেন আপনি কি অমুক? হ্যাঁ, বলতেই দুহাত দিয়ে হাত চেপে ধরলেন আমাকে। চাপা গলায় প্রশ্ন করলেন, ‘আপা আর তো পারি না। আর কতদিন?’ সরকার কর্তৃক সম্প্রতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া একটি ব্যাংকে চাকরি করেন তিনি। জানালেন নানান কষ্ট আর যন্ত্রণার কথা, অবশ্য চাপা ভয়ের গলায়। একই রকম ভয়ের কণ্ঠে আকুতি জানালেন আর এক অচেনা যুবক। ভদ্রমহিলাকে কিছু না বললেও ছেলেটিকে সরাসরি প্রশ্ন করলাম আমি। যে প্রশ্নটি সরকারি দলের লোকজন সব সময়ই কটাক্ষ ভরে জিজ্ঞাস করে আমাদের। বললাম এতই যদি যন্ত্রণা তবে পথে নামেন না কেন? এবার চাপা অথচ স্পষ্ট গলায় বলল ছেলেটি, ‘গুলি করে যে’।
কী ভীষণ ভয়ের রাজ্যে বাস করি আমরা। লাকসাম পৌর বিএনপি’র নিখোঁজ সভাপতি হুমায়ুন পারভেজের পরিবার থাকে আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর আজ প্রায় ৪ বছর হলো নিখোঁজ তিনি। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে ভাবীর প্রধান চিন্তা এখন কোনোক্রমে টিকে থাকা। দেখা হলেই প্রশ্ন করেন গুম হওয়া পরিবারগুলোর জন্য নতুন কোনও আইন করা যায় না যাতে অন্তত নিখোঁজ ব্যক্তিটির পরিবার তাঁর সম্পত্তি বিক্রি করে জীবনধারণ করতে পারে? তার মতে গুম বা নিখোঁজ যেহেতু এখন প্রতিদিনকার ঘটনা তাই সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে অবিলম্বেই এমন একটি আইন হওয়া প্রয়োজন।

আসলে অতি মাত্রায় সহনশীল জাতি আমরা। আমরা গুমে অভ্যস্ত হয়ে ওঠি, খুন বা বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে স্বাভাবিক ভাবে নিতে থাকি, চাপাতির কোপ কিংবা সাদা পোশাকের গুলিতে মরি, ধর্ষণের শিকার হই, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নামক রক্ষকের ভক্ষণে পরিণত হই কিন্তু বিচার চাইবার সাহস পর্যন্ত রাখি না। গুম হওয়া অনেক ব্যক্তির পরিবার এখন শুধু লাশটি ফেরত চান আর অনেকে সেই আশাও ছেড়ে দিয়েছে। অতি ভাগ্যবানদের কেউ কেউ অবশ্য নিখোঁজ হওয়ার পর ফিরে আসে কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে কিছুই মনে করতে পারে না তারা।

হাওর এলাকায় ঠিকাদার, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি আর জনপ্রতিনিধির সম্মিলিত অনিয়ম, দুর্নীতি আর লুটপাটের দায় ‘অতিবৃষ্টির’ ওপর চাপিয়ে নিশ্চিন্ত থাকে মন্ত্রী এদিকে চালের দাম ইতিহাসে সর্বোচ্চ হওয়ার পর বিশ্বে সর্বোচ্চ হওয়ার গৌরব অর্জন করে। চালের মজুত যখন তলানিতে তখন পত্রিকায় দেখি এরই মধ্যে ৯৫৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চাল সিন্ডিকেট। পত্রিকার হেডলাইন হয় ‘ভাত কম খাচ্ছে মানুষ’ কিন্তু আমরা নির্বিকার। নিজেদের পাপ লুকাতে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ধসের জন্য দায়ী করি ‘বজ্রপাতকে’। আর এই হাস্যকর কথা হজম করার সুযোগ নিয়ে গোপনে বাড়তে থাকে লাশের সংখ্যা। ক্রসফায়ার আর মামলার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করে পুলিশ। না আছে জবাবদিহিতা, না হয় বিচার।

চারপাশে এক থমথমে পরিস্থিতি, চাপা ভয়, জমে থাকা ক্ষোভ। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং অত্যাচার এখন আর কেবল বিরোধীদলের নেতা কর্মীদের প্রতি সীমাবদ্ধ নেই। এটি ছড়িয়ে পড়েছে সর্বস্তরে। গুটিকয় সুবিধাভোগী ছাড়া বেশির ভাগ মানুষ আতঙ্কিত। তারা বলতে ভয় পায়, লিখতে ভয় পায়, এমন কী স্বাধীন ভাবে চিন্তা করতে পর্যন্ত আতঙ্কিত বোধ করে। ৫৭ ধারা আছে না?

অন্যান্য গণমাধ্যমকে লাইনে আনার পর এখন অনলাইন গণমাধ্যমকেও নীতিমালার আওতায় আনছে সরকার। নীতিমালার যে খসড়াটি দেখলাম তা ৫৭ ধারার চেয়ে কোনও অংশেই কম ভয়ঙ্কর নয়। চারপাশে একটি ভয়ের জগত তৈরি করে, উন্নয়নের গল্প শুনিয়ে, জনগণের হাত থেকে সকল ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার দোহাই দিয়ে মানুষকে তিলে তিলে মারার চেয়ে একবারে সংবিধান সংশোধন করে আমৃত্যু ক্ষমতা নিশ্চিত করে, সকল বিরোধী দল নিষিদ্ধ করে দিলে মানুষ অন্তত সাময়িকভাবে বাঁচে। বিনা ভোটে জাকিয়ে বসা সরকার ও তার বর্ধিতাংশের জন্য এটি খুব কঠিনও কিছু নয়।

লেখক: আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ

আরও পড়তে পারেন