রবিবার, ১লা সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

একজন কমলালেবু : শাহাদুজ্জামানের কষ্টিপাথর

ভোরের সংলাপ ডট কম :
মে ২২, ২০১৭
news-image

১. ‘If the novel is an art and not merely a ‘literary genre’, the reason is that the discovery of prose is its ontological mission, which no art but the novel can take on entirely.’ -Milan Kundera (Testaments Betrayed)

শাহাদুজ্জামানের সম্প্রতি প্রকাশিত উপন্যাস ‘একজন কমলালেবু’ নিয়ে কিছু বলার আগে কুন্ডেরার এই বক্তব্যটা খোলাসা করা দরকার। কুন্ডেরা বলছেন, উপন্যাসকে নেহাত একটা ‘Literary genre’ হিসেবে না দেখে ‘আর্ট’ হিসেবে দেখা যেতে পারে, এই কারণে যে, এর অস্তিত্বেও মূল অভিমুখ হচ্ছে ‘Discovery of prose’, অর্থাৎ গদ্যে নব নব আবিষ্কার। উপন্যাস এই ‘Discovery of prose’ এর অভিযাত্রাকে যেভাবে ধারণ করতে পারে আর কোন শিল্প তা পারে না।

এই সূত্রে প্যারিস রিভিউয়ে ক্রিস্টিয়ান সালমনকে দেওয়া তার সাক্ষাৎকারটিকেও উল্লেখ করা যায়। যেখানে তিনি গত শতাব্দীর তার এক প্রিয় ঔপন্যাসিকের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘…novel had tremendous synthetic power, that it could be poetry, fantasy, philosophy, aphorism, and essay all rolled into one’. তিনি আরো বলেছেন, ‘…Throughout its history, the novel has never known how to take advantage of its endless possibilities. It missed its chance’.
এই যে উপন্যাসের অন্তহীন সম্ভাবনার কথা কুন্ডেরা বলছেন, সেই আলোকেই আমরা বিচার করে দেখতে পারি শাহাদুজ্জামানের ‘একজন কমলালেবু’ উপন্যাস কি না। যদিও শাহাদুজ্জামান তার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারেও বলেছেন সাহিত্যের এই ক্যাটাগরাইজেশনের ব্যাপারে তিনি বিশেষ আগ্রহী নন এবং তা পাঠকের উপর ছেড়ে দিতে চান। তবু কুন্ডেরার ‘Discovery of prose’, ‘all rolled into one’ বা ‘endless possibilities’ কথাগুলোর সূত্র ধরে একে আমি উপন্যাস হিসেবেই বিবেচনা করতে চাই।

আমাদের ‘একজন কমলালেবু’ নিয়ে আলোচনার শুরুতেই এমন তর্কের বিষয়টা পরিষ্কার করে নিলাম যাতে পরবর্তী আলোচনার পথ সুগম হয়।

আধুনিকতার ১৮ শতকীয় প্রগতির সরলরৈখিক ধারণা যখন ধীরে ধীরে হুমকির মুখে পড়া শুরু হল তখন থেকেই পোস্টমডার্ন সাহিত্য, পেইন্টিং কিংবা সিনেমার একটা চল লক্ষ্য করা যায়। তখন শিল্পবোদ্ধারা এই ধরনের শিল্পকর্মকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়ে যান: Julian Barnes যখন Nothing to be frightened of লিখেন তখন তা ফ্লবার্টের সাহিত্য-জীবন আলোচনা না কি ফিকশনাল কোন আত্মবয়ান অথবা প্রবন্ধ তা বুঝতেই বেসামাল হয়ে পড়েন তথাকথিত পাঠক কিংবা শিল্পবোদ্ধারা। The Dreamers সিনেমা দেখার পর দ্বিধায় পড়তে হয়- এটা কি ১৯৬৮ সালের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস নাকি উত্তরাধুনিক যুগে অস্তিত্ব সংকট কিংবা মূল্যবোধ পরিবর্তনের চিত্রায়ণ এবং চোরাগোপ্তাভাবে ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ ফিল্ম মুভমেন্টের নান্দনিক বয়ান? মিলান কুন্ডেরা যখন ‘Life is Elsewhere’ এ জারোমিল নামক কবি চরিত্রের রূপকের মোড়কে আর্থার র্যাঁবো, মায়াকভস্কি কিংবা লেরমন্তভের কবি জীবন চুপিচুপিভাবে অনুভূতিতে মিশিয়ে দেন; তখন প্রশ্ন জাগে লেখক মিলান কুন্ডেরা ফিকশনের আড়ালে অন্য এক সাহিত্য যাপনের জগতকেই যেন উন্মোচন করছেন। এত সব প্রসঙ্গ আনার পেছনে একমাত্র হেতু ‘একজন কমলালেবু’ বইটি।

এই বইয়ের দারুণ এবং সেইসঙ্গে ভয়াবহ দিক হল– এটা বাংলা সাহিত্যের সেই চরিত্রের জীবন নিয়ে লেখা যাকে লেখক অন্নদাশঙ্কর অভিধা দিয়েছেন– শুদ্ধতম কবি, মার্কিন গবেষক ক্লিনটন বি সিলি বলেছেন– A Poet Apart, বুদ্ধদেব বসু তাকে বলতেন– নির্জন কবি, বিনয় মজুমদার ডেকেছেন– ধূসর। সেই একজনকে শাহাদুজ্জামান এবার ডাকলেন ‘একজন কমলালেবু’ বলে।

জীবনানন্দ দাশের কথাই হচ্ছে এখানে। কমলালেবু’র মত দৈনন্দিন আটপৌরে বিষয় নিয়ে বাংলা সাহিত্যে তারই লেখা কবিতার লাইন এখনো ভাবায়– কেন একজন কবি পরজন্মে কমলালেবু নিয়ে ফিরে আসতে চান পরিচিত মুমূর্ষুর বিছানার কিনারে? যাপিত জীবন এবং সাহিত্য জীবনের মধ্যকার চরম বিরোধে লিপ্ত জীবনানন্দের জীবনেই অর্ডিনারি কমলালেবু করুণ মাংস নিয়ে আসতে পারে কিংবা প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া ঘাসের লোভে চরে বেড়ায় পৃথিবীর ডায়নামোর ’পরে।

২. শাহাদুজ্জামানের জীবনানন্দ ‘বোধ’
শাহাদুজ্জামানের ‘পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ’ বইয়ের নামটাতেই জীবনানন্দ হাজির উজ্জ্বলভাবে। সেই গল্পগ্রন্থের ১ম গল্প ‘১৮৯৯’ যা জীবনানন্দের জন্মসাল– সেই গল্পে এক জায়গায় শাহাদুজ্জামানের উল্লেখ্য লাইন প্রণিধানযোগ্য:
‘লেখা, শুধু অক্ষর সাজিয়ে নির্মাণ করা বিকল্প এক জীবন আমাদেরও গ্রন্থিমাংসের পুনরুক্তি আর জীর্ণশীর্ণ মূল্যবোধের হাত থেকে নিস্তার দেয়। আমরা বাস্তবিক পুঁইশাকের চচ্চরি আর কুঁচো চিংড়ির ঘণ্ট খাই হয়তোবা তবু দূরে কোথাও গিয়ে পশ্চিমের মেঘে আবিষ্কার করি সোনার সিংহ’।
ওই গ্রন্থেরই ‘কাগজের এরোপ্লেন’ গল্পে দেখা যায় ‘আমি’ রূপে গল্পের ন্যারেটর গভীর রাতে ব্রিজের ধারে কল্পিত আরেকজনের নানা দার্শনিক প্রশ্নের সম্মুখীন হন। এমনই সময়ে ট্রেনে পিষ্ট হয়ে আত্মহত্যা করা বন্ধু রফিকের নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে গল্পের বয়ানকারী– ‘আমরা কেউ ভাতের উপর উঠতে পারলাম না। ভাতের ক্লেদের উপর’।

রফিকের মেয়ে গল্পের বয়ানকারীর সঙ্গে একদিন এক অভিনব খেলায় মেতে উঠেছিল। মেয়েটা ছুটে এসে তাকে বলেছিল, ‘আমাকে ধরো দেখি কাকু!’
তখন কাকু তাকে ধরার পর মেয়েটা বলে, ‘এ কী! তুমি তো আমার হাত ধরেছ, আমাকে ধরেছ কই?’
গল্পের এই অংশের সঙ্গে জীবনানন্দের ‘বোধ’ কবিতার মিল পাই যেন–
‘সকল লোকের মাঝে ব’সে
আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা?
…………
লেখকের ‘অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প’ তে দেখি গল্পের কথক জীবনানন্দের এক গল্প নিয়ে রীতিমত ব্যবচ্ছেদে বসেছেন তার এক বন্ধুর সঙ্গে। গল্পের শেষে জীবনানন্দের সাহিত্যে ‘বিধাতার খেল’, ‘অন্ধকার’ নিয়ে গূঢ় দর্শন তুলে ধরেন সহজ গল্পের আধারে।

ক্যাডেট কলেজ জীবন নিয়ে লেখা তার লেখা ‘খাকি চত্বরের খোয়ারি’তেও স্পষ্ট বয়ান রয়েছে জীবনানন্দের ‘হাওয়ার রাত’, ‘বোধ’ এবং ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার সঙ্গে তার প্রথম মোলাকাতের। এটাই খেয়াল করার বিষয় যে, জীবনানন্দের জীবন-মৃত্যু ভাবনা, জীবন নিয়ে দ্ব্যর্থক দর্শন, সময়গ্রন্থি ইত্যাদি ভাবনা দ্বারা শাহাদুজ্জামান তার সাহিত্যজীবনের শুরু থেকেই আচ্ছন্ন ছিলেন।

সেই সূত্রে ‘একজন কমলালেবু’ তার ড্রিম প্রজেক্ট বলে ধরে নেওয়া যায়। শাহাদুজ্জামানের গল্প, প্রবন্ধ, চলচ্চিত্র সমালোচনাসহ নানাবিধ লেখায় জীবনানন্দ-ঘোর স্পষ্ট হয়ে উঠে। কখনো গল্পের নাম দেন জীবনানন্দের কবিতা থেকে, অথবা গল্পের মাঝে জুড়ে দেন জীবনানন্দের কোন কবিতা অথবা সুযোগ পেলেই চোরাগোপ্তা স্রোতে জীবনানন্দ বিশ্লেষণ জুড়ে দেন নিজের যেকোন লেখায়। এত কবিতা প্রেম অথচ বিশদ সাহিত্যকর্মের মধ্যে শাহাদুজ্জামানের কবিতা দেখিনি আজও। বোধহয় শাহাদুজ্জামান এটা ভাবেন যে, ‘রবীন্দ্রোত্তর যুগে বাংলা কবিতার বাঁক বদলে দেওয়া জীবনানন্দের কবিতার পথ ধরেই চলছে বাংলা কবিতা। এখনও’। কবির আসনটা যেন শুধুই জীবনানন্দের। আর কারও কবিতা যেন কবিতা হয়ে ওঠে না।

শুধু জীবনানন্দের কবিতা দিয়েই তিনি আচ্ছন্ন নন। জীবনানন্দের মৃত্যুর পর তার কালো ট্রাঙ্কে অপ্রকাশিত সব গল্প-প্রবন্ধ-উপন্যাস-লিটারারি নোটসে শাহাদুজ্জামান গভীরভাবে খুঁজে পান বিপন্ন বিস্ময়ে পৃথিবীর দিকে তাকানো ট্রামের ক্যাচারে আটকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া প্রথম এবং শেষ মানুষ জীবনানন্দ দাশকে। ‘একজন কমলালেবু’র পেছনে গ্রন্থপঞ্জি ঘাঁটলে দেখা যায় জীবনানন্দ নিয়ে আজ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য যেকোন ধরনের লেখাই তার রেফারেন্স থেকে বাদ যায়নি।

এপর্যন্ত আমি এটাই বোঝাতে চাইছি যে, একজন বর্তমান লেখক তার একজন প্রিয় সাহিত্যিকের প্রতি কি ধরনের জীবন-মৃত্যু-দর্শন বোধের তাড়নায় আচ্ছন্ন হয়ে একটা সাহিত্যকর্মে হাত দিতে পারেন। অবশ্যই বলতে হয়, নিজের জীবন দীক্ষায় জীবনানন্দের মত বিহ্বল আগ্রহ নিয়ে জীবনের দিকে তাকাতে চান শাহাদুজ্জামান। শাহাদুজ্জামান যখন বলেন যে, শৈশব থেকে জীবনানন্দের যে ভূত আচ্ছন্ন হয়ে তার উপর আছর করেছে; সেই ভূতকেই যেন নিজে ওঝা হয়ে নামাতে চান ‘একজন কমলালেবু’ লেখার মাধ্যমে।

৩. একজন কমলালেবু
একজন কমলালেবু নিয়ে আমি বিস্তারিত টিপিকাল বুক রিভিউ করব না। না করার কারণ হিসেবে শাহাদুজ্জামানেরই একটা গল্পের লাইন উদ্ধৃত করতে পারি–
‘… সাহিত্য আমার কাছে ধন উপার্জন কিংবা খ্যাতির পরিপূরক কোন মাধ্যম নয়। এ আমার বেঁচে থাকার মতো প্রয়োজনীয় খাদ্য মাত্র। ভেবেছিলাম বেঁচে থাকবার একটাই তাৎপর্য, লিখব। লেখালেখি ছাড়া পৃথিবীর বাকি যাবতীয় কাজ আমার কাছে হাস্যকর। কিন্তু ক্রমশ টের পাচ্ছি লেখালেখি আমাকে দিয়ে হবে না। সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন সৃষ্টিক্ষম প্রজ্ঞার। সেই প্রজ্ঞার উৎসভূমি আমার মধ্যে নেই। আছে প্রবঞ্চনা। এ ছাড়া লিখতে পারি অন্যের সাহিত্য নিয়ে আলোচনা। কিন্তু তাতে কি লাভ? যার ভালো লাগার আমি না লিখলেও সে পড়বে…’
শাহাদুজ্জামানের এই গল্পাংশের সঙ্গে ‘একজন কমলালেবু’র ১৮৮ পৃষ্ঠায় জীবনানন্দের জীবনে একটু ডুব দেই এবার: ‘ঝেঁপে আসুক অন্ধকার, না থাক চাকরি, না খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে হোক, তবু মরে যাবার আগে আরও কিছু লেখা তার লিখতে হবে, এমনই ভাবলেন জীবনানন্দ। ডুবতে বসা মানুষের কাছে ভেসে যাওয়া টুকরো কাঠ যেমন, লেখা তাঁর কাছে তাই’।

জীবনবাবুর কাছে জীবনের সমার্থক হয়ে উঠেছিল লেখালেখি। এর অপর পিঠ মৃত্যুচেতনা। লেখা>মৃত্যু যেন। মৃত্যু এবং লেখার ভেতর লেখাকে বেছে নিলেন জীবনানন্দ– এমনটাই জানান দেন শাহাদুজ্জামান।

সাহিত্যিকদের যাপিত জীবন এবং সাহিত্যিক জীবনের মধ্যে একটা বিরোধ যেন সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে লেগে থাকে। ‘একজন কমলালেবু’ আপাত দৃষ্টিতে ডকুফিকশন ঠেকলেও এসব নানাবিধ প্রশ্নের উত্তরই স্পষ্ট ভাষায় উচ্চারণ করেছেন শাহাদুজ্জামান। ভূমেন্দ্র গুহ সম্পাদিত ‘জীবনানন্দের দিনিলিপি, ক্লিনটন বি সিলির ‘অ্যা পোয়েট এপার্ট’সহ অন্যান্য সব বই থেকে জীবনানন্দের জীবনের বায়োগ্রাফিক স্কেচের পাশাপাশি শাহাদুজ্জামান চোরাগোপ্তা স্রোতে জীবনানন্দের কথাসাহিত্যে কীভাবে তার যাপিত জীবনের বেকারত্ব, অসুখী দাম্পত্য জীবন, প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক সমাজের দ্বারা একের পর এক বিক্ষুব্ধ আক্রমণ ইত্যাদি উল্লেখিত হয়েছে তারই ব্যক্তিগত স্কেচ এঁকেছেন।

সাহিত্যের সঙ্গে সরলরৈখিক জীবন নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে লেখক জীবনানন্দকে জীবনযুদ্ধ যেন খাদের কিনারায় নিয়ে এসেছিল। সেই খাদের পরিণতি কিংবা বিপদ সমূহ শাহাদুজ্জামান ‘একজন কমলালেবু’ উপন্যাসে সম্পাদনা করেছেন যেন।

জীবনানন্দের কথাসাহিত্যে যেমন একেবারে নিটোল ব্যক্তিজীবনের বিষয়াদি উঠে এসেছে, ঠিক বিপরীতভাবে তাঁর কবিতায় এসেছে মহাকাল, সময়গ্রন্থি, ইতিহাসচেতনা, মহাবিশ্বসহ অন্যান্য ব্যাপক ধারণা। ‘একজন কমলালেবু’তে শাহাদুজ্জামান ঘোষণা দিচ্ছেন তেমনি ধারণা ‘সময়গ্রন্থি’র কথা:
‘আইনস্টাইনের সময়ের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব বিষয়েও জীবনানন্দ ভালোভাবে ওয়াকিবহাল ছিলেন। আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত জীবন একটা সীমিত কালে, সেটা ব্যক্তিকাল, কিন্তু আমরা সবাই আবার মানবজাতির অংশ। ব্যক্তিমানুষের মৃত্যু হলেও মানবজাতির মৃত্যু হয় না, প্রত্যেকের মানুষ তাই একটা মানবকালেরও অংশ। আবার মানবজাতিও অনন্তকাল এই পৃথিবীতে নেই। মানবের জন্ম হবার আগেও ছিল মহাবিশ্ব, ফলে সব মানুষ আবার সেই মহাকালেরও অংশ। মানুষ মাত্রই তাই বিচরণ করে ব্যক্তিকাল, মানবকাল আর মহাকালের ভেতর। সময়ের এসব পর্বকে বোঝাতে জীবনানন্দ জন্ম দিয়েছেন ‘সময়গ্রন্থি’ বলে একটা শব্দের’।

শাহাদুজ্জামান, ব্যক্তি জীবনানন্দের লেখার পেছনে যে ভাবনাগুলো কাজ করেছে- তাই যেন সংগোপনে সাবধানে বয়ান দিয়ে গেছেন। শোভনার প্রতি ব্যর্থ ভালোবাসা, অসুখী দাম্পত্য, লেখককূলের কাছ থেকে পরিহাস-ভুল বোঝাবুঝি এগুলোর পাশাপাশি শাহাদুজ্জামান বর্ণনায় দিচ্ছেন সেই সব প্রাত্যহিকতার সময়ে তাঁর রচিত সাহিত্যে প্রস্ফুটিত দর্শন-ভাবনা। সোজা কথায়, জীবনানন্দের সাহিত্য দিয়ে তাঁর যাপিত জীবনকে বোঝার চেষ্টায় ব্রত হয়েছেন শাহাদুজ্জামান।

৪. নাটকীয় জীবনানন্দের ট্রাম চিত্রনাট্য
‘একজন কমলালেবু’র শুরুটাই জীবনানন্দের জীবনের অন্তিম মুহূর্ত দিয়ে। যে ট্রাম দুর্ঘটনায় জীবনানন্দ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, শাহাদুজ্জামান সেই মৃত্যুর পটেও পাঠকদের সামনে হাজির করেন ট্রাম নিয়ে জীবনানন্দের একটা কবিতা, যেখানে তিনি ট্রামকে ডাকছেন ‘আদিম সর্পিনী সহোদরা’ বলে। এরপর আস্তেধীরে জীবনানন্দের কথাসাহিত্যে ও ডায়েরিতে ডুব দিয়ে শাহাদুজ্জামান তুলে আনতে থাকেন তার ব্যক্তিগত জীবনের ছায়াছবি। আবার পরক্ষণেই তিনি কবিতা দিয়ে বোঝাতে থাকেন জীবনানন্দের যাপিত জীবন নিয়ে গভীরতর জিজ্ঞাসাগুলো।

‘একজন কমলালেবু’ খুব সুকৌশলে কথাসাহিত্য ও কাব্যেরও যেন একটা পোস্টমর্টেম প্রক্রিয়া চালু রাখে। কথাসাহিত্যে ও কাব্যের মাঝে যেন একটা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে হাজির হন আমাদের ধূসর জীবনানন্দ। এই মধ্যস্থতায় জীবনানন্দ প্রায়শই সম্মুখীন হয়েছেন সংশয়ের। কবিতা না উপন্যাস? কোনটা জারি রাখবেন তিনি? তিনি চান টলস্টয় আর গ্যেটের পর্যায়ে যেতে। আবার পরক্ষণেই ভাবেন তার এ স্বপ্ন হয়তো দুরাশায় পর্যবসিত হবে।

জীবনানন্দ যেন ভবিষ্যতদ্রষ্টা। ১৪ অক্টোবর ১৯৫৪ সালে ট্রাম দুর্ঘটনায় পতিত হবার তিনদিন আগে ১১ অক্টোবর তার ভাই অশোকের বাসায় এসে অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসেন–
‘এই ফ্ল্যাটের কেউ কি দেশপ্রিয় পার্কের কাছে কোন জায়গায় ট্রামের নিচে পড়ে আহত হয়েছে?’
১২ অক্টোবরও তিনি একই কাণ্ড করে বসলেন। জীবনানন্দের জীবনের চিত্রনাট্য যেন সাজিয়ে দিচ্ছেন শাহাদুজ্জামান।

৫. জীবনানন্দ নামক ছায়াছবিতে চিত্রনাট্যকার শাহাদুজ্জামান
সিনেমাটিক একটা শুরুর মাধ্যমে ‘একজন কমলালেবু’র বয়ান শুরু। ট্রামের ক্যাচারে আটকে আহত জীবনানন্দ ভর্তি হলেন হাসপাতালে। এই দৃশ্য দিয়ে জীবনানন্দের অন্তিম দিনগুলো দিয়ে শুরু করলেন শাহাদুজ্জামান। নামজাদা পরিচালক রিচার্ড এটেনবোরো’র সব সিনেমার কথা মনে পড়ে যায়- যিনি চার্লি চ্যাপলিন, গান্ধী, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের জীবনকে এক সুতোয় চলচ্চিত্রে নিয়ে আসেন। শাহাদুজ্জামান তেমনই বাংলা কবিতার বাঁক ফেরানো কবি কিংবা তুতেনখামেনের ট্রাঙ্কে বন্দি কথাসাহিত্যিক জীবনানন্দের সম্পূর্ণ জীবন থেকে ছেঁকে ছেঁকে একটা সিনেমাটিক বায়োগ্রাফি হাজির করেন আমাদের সামনে।

জীবন কি ব্যাখ্যাতীত গভীরতর অন্ধকারের আস্বাদন? আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে বিধাতার খেল কিংবা নির্মমতা কত অন্ধকারে আমাদের গ্রাস করে? জীবন কি ইব্রাহীম বক্সের অমীমাংসিত সেই বক্স যেখানে আপাত মনে হয় সব সমাধান আছে কিন্তু হয়তোবা নেই? মহাশূন্যে সাইকেল চালানো কি দূরত্বের আকাঙ্ক্ষা না কি বিচ্ছিন্নতার ফল? বানের পানিতে ভাসতে থাকা মা বেবুন তার শিশুকে শেষ পর্যন্ত না বাঁচিয়ে নিজেকেই কেন বাঁচাতে চেয়েছিল?

শাহাদুজ্জামানের প্রিয় সাহিত্যিক জীবনানন্দ দাশের জীবনকে এত বিস্তর গভীরভাবে বুঝতে চেয়ে তিনি হয়তো নিজের জীবনেরই একটা অর্থ খুঁজতে চেয়েছেন যেন। ‘একজন কমলালেবু’র প্রথমেই তিনি পাঠককে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন– ট্রামের নিচে জীবনানন্দের মৃত্যু কি একটা দুর্ঘটনা? নাকি আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড? বহুধা বিন্যস্ত মানব জীবনে নানা প্রিজমের খেল কিংবা বিকীর্ণ আলো যেমনই খেলা করে তেমনই তিনি চেখে দেখেছেন সেলফ-রিফ্লেক্সিভ জীবনানন্দ দাশকে।

৬. উপন্যাস নাকি আরো অন্যকিছু
উপন্যাস নিয়ে প্রথমে যে বয়ান তুলে ধরলাম তা ‘একজন কমলালেবু’র প্রসঙ্গে বলতে হবে কারণ কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান তার লেখক জীবনের শুরু থেকেই নানা নীরিক্ষার মধ্য দিয়ে গেছেন এবং তার এই চেষ্টা এখনো নিরন্তর। ‘একজন কমলালেবু’ নিয়ে অনেকেই অনেক বিতর্ক-কুতর্ক তুলতে পারেন তবে এটুকু স্বীকার করা যায় যে, বাংলা কথাসাহিত্যে উপন্যাস লিখনে নতুন নতুন মাত্রা যোগ করছেন তিনি।

শাহাদুজ্জামানের এ ধরনের লেখা প্রথম নয়। এরআগেও তিনি চার্লি চ্যাপলিনের জীবন নিয়ে লিখেছিলেন ‘চ্যাপলিন, আজো চমৎকার’, কর্নেল তাহেরকে নিয়ে লিখেছেন ‘ক্রাচের কর্নেল’, ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে নিয়ে লিখেছেন ‘আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে’। একটার সাথে আরেকটার তুলনা না করেই বলছি, এ ধরনের জীবনীভিত্তিক রচনাগুলোকে ফর্মে বিভাজিত করা লেখকের প্রতিই অন্যায় করা হয়। আগেই বলেছি, এটি কেন আমার কাছে ‘উপন্যাস’। শাহাদুজ্জামানের বোঝাপড়ায় জীবনানন্দের জীবন আখ্যান যেন উপন্যাসের জন্যই গদ্যের নতুন আবিষ্কারে পাঠকের মনে স্থান করে নেয়।

শাহাদুজ্জামান নিজেই নানা সেমিনার, লেখায় বলেছেন- তিনি ফিকশন ও নন-ফিকশনের মাঝামাঝি একটা ধূসর স্পেসে এই বোঝাপড়াকে স্থান দিতে চান। পাঠকই বিচার করে নেবেন এ সাহিত্যকর্মের যথার্থতা। জীবনানন্দ দাশ যেহেতু ‘একজন কমলালেবু’র প্রধান চরিত্র তাই এই বইয়ের ফর্ম নিয়ে নানা আপত্তি উঠতেই পারে। জীবনানন্দ দাশ সবার ভালোবাসার অবিসংবাদিত পাত্র। কেউ জীবনানন্দকে দেখেন রবীন্দ্রনাথের পরে সেরা কবি হিসেবে, কেউ দেখেন নির্জন কবি, কেউ বলছেন শুদ্ধতম। শাহাদুজ্জামান জীবনানন্দকে দেখেছেন এমন এক কালোত্তীর্ণ সাহিত্যিক হিসেবে যার ভেতরে ব্যক্তিকাল, মানবকাল ও মহাকাল এক চক্রে বিরাজ করেছিল। যিনি সাহিত্যের অক্ষরে মোড়া জীবনকে যাপিত সাধারণ জীবনের থেকে বেশি ব্রত করেছিলেন। যিনি একই সাথে ভবিষ্যতের দৃশ্যকল্প রচনা করে গিয়েছিলেন- যিনি আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার জয়জয়কারের কালে সুদূর ভবিষ্যতের আশঙ্কা উচ্চারণ করে গেছেন–
‘একটা মোটরকারের পথ-মোটরকার
সব-সময়েই আমার কাছে খটকার মতো মনে হয়েছে,
অন্ধকারের মতো।
আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না;
আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে-হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে,
পৌঁছে অনেকক্ষণ ব’সে অপেক্ষা করবার অবসর আছে।
জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতার উত্তেজনা
অন্য সবাই এসে বহন করুকঃ আমি প্রয়োজন বোধ করি নাঃ
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।’

শাহাদুজ্জামান জীবনানন্দে খুঁজে পেয়েছেন জীবনের দ্বৈধতা। জীবনের ভালো-মন্দ, আশা-নিরাশার দোলাচলে আলাদাভাবে দোল না খেয়ে দ্বৈধতাকে সত্য মনে করেছেন জীবনানন্দ। এটাই শাহাদুজ্জামান স্পষ্ট করেন পাঠকের সামনে। ‘বিপন্ন বিস্ময়’এ তাকানো জীবনে জীবনানন্দ যেন খুঁজে পেয়েছেন একটা গভীর অসহায়ত্ব, নির্মমতা। এই বিপন্ন বিস্ময়ই জীবনের ধ্রুব সত্য, আর্টের কঠিন শর্ত– শাহাদুজ্জামান ‘একজন কমলালেবু’র মাধ্যমে এই বার্তাই যেন দিতে চান। ঠিক যেমনই শাহাদুজ্জামানের অন্যান্য সাহিত্যকর্মে আমরা কুন্ডেরা, মুরাকামি কিংবা তারকোভস্কিকে খুঁজে পাই চুপচাপ, ফিসফাস। এই চুপচাপ নিনাদ আমাদেরকে বোধের গভীরে নিয়ে যায়।

‘একজন কমলালেবু’ শাহাদুজ্জামানের নিজেকে যাচাই-কষ্টিপাথরে ঘঁষে তিনি আরো অমোঘ গভীরে স্পন্দন দিতে চেয়েছেন তার সার্থক সাহিত্যের প্রশ্নগুলোকে। কষ্টিপাথরের নাম: শুদ্ধতম কবি-মিলু-ধূসর কবি-নির্জন কবি-তুতেনখামেনের ট্রাঙ্কে লুকানো কথাসাহিত্যিক-একজন কমলালেবু। তিনি জীবনানন্দ দাশ।

‘একজন কমলালেবু’র পরে ওঝা হয়ে কি ‘জীবনানন্দ ভূত’ নামাতে পেরেছেন শাহাদুজ্জামান? কি জানি, তবে এটুকু বলা যায় যে, জীবনানন্দের মত সহস্র বছরের নাবিকের ভূত সহজে নামার নয়।