বৃহস্পতিবার, ৪ঠা সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

‘সংস্কৃতি’ ঐতিহ্যের লালিত সেতুবন্ধন

ভোরের সংলাপ ডট কম :
মে ২, ২০১৭

শাহীন আলমঃ
সংস্কৃতি (Culture ) গোটা মানবজাতির অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ, একটি অর্জন। মানবজাতির সৃষ্টির রহস্য সংস্কৃতি দ্বারা নিয়ম শৃঙ্খলিত। মানববৃত্তির উত্তম প্রকাশ ঘটে সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমেই। জীবন-জগৎ সম্পর্কে কোন জনপদের মানুষের বোধ-শক্তি বিশ্বাস ও আশা আকাঙ্খার রুপময় প্রকাশই হলো ঐ জনপদের সংস্কৃতি। পরিবেশ, রাষ্ট্রীয়, অর্থনীতি, সামাজিক বিষয়াদির পাশাপাশি সংস্কৃতিও মানুষের জন্য আগামী পৃথিবীকে উর্বর ও টেকসই রাখার পূর্বশর্ত হিসেবে গণ্য। সংস্কৃতি সমরুপ নয় বরং বহুবিধ বৈচিত্র্যময় সৃজনশীলতার মূল গ্রোথিত রয়েছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে (Heritage) প্রস্ফূটিত হয় অন্য সংস্কৃতির সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে। ঐতিহ্য হলো মানুষের অভিজ্ঞতা ও মহাপ্রাণতার প্রামাণিক দলিল। তা সংরক্ষণ, প্রবৃদ্ধিকরণ ও ভবিষ্যৎ প্রজম্মের নিকট হস্তান্তর করতে হবে। সংস্কৃতিকে ভিন্ন মাত্রার বিভাজনের মাধ্যমে অনুসন্ধান করা হয়: মনস্তাত্ত্বিক, বস্তুগত, পরিবেশগত, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও নান্দনিক। মোটা দাগের এই প্রকরণ গুলো আর কিছুই নয়, সংস্কৃতির ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন রুপ। বিশ্ববিখ্যাত লেখক টাইলরের ১৮৭৭ সালে প্রকাশিত ‘‘প্রিমিটিভ কালচার’’ গ্রন্থটি আলাদা জ্ঞানক্ষেত্র হিসেবে সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা দান করে। তখন থেকে একাডেমিক পরিমন্ডলে এটি একটি মৌলিক প্রত্যয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। জাতিসংঘ সদস্যভুক্ত দেশগুলোতে ইউনেস্কো নেটওয়ার্কে বিস্তৃত করে সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রীয় কার্যসূচীর আওতায় এনে ২১শে মে ‘বিশ্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহীত হয়। পরিতাপের বিষয় হলো এই যে, গ্রহীত এ সিদ্ধান্তটি বিস্তৃত পরিমন্ডলে এখনো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। সুস্থ সংস্কৃতির পরিমন্ডলকে আড়াল করে একঘেয়েমী অপসংস্কৃতিকে মানবমনের খাদ্য হিসেবে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সুস্থ সংস্কৃতির মাধ্যমে ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য, আচার-আচরণ, সামাজিকতা, পারিবারিক বন্ধন, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ইত্যাদি বিষয়াবলীর পরিচয় বহন করে। পরিচয় বহনের এই মাধ্যমটি যে জাতির যত বেশী শক্তিশালী সে জাতি তত বেশী উন্নত, আত্মবিশ্বাসী এবং সংস্কৃতিবান। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব কালচারাল পলিসির আহবায়ক অধ্যাপক ড.ওল্ফগ্যাং শ্নেইডারের মতে, সাংস্কৃতিক নীতি একটি সামাজিক নীতি । সংস্কৃতি মানব সত্তার গভীরে গ্রোথিত এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বিষয়ক গবেষনা সংস্কৃতির গণতন্ত্রায়ন অগ্রসর চিন্তা এবং নতুন পথ উম্মোচিত করবে। তিনি সংস্কৃতির সংজ্ঞায় বলেন, সংস্কৃতি হলো ‘‘ সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষ যে জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্প, নৈতিকতা, আইন, প্রথা এবং অন্যান্য সামর্থ্য ও অভ্যাস প্রাপ্ত হয়, সেগুলোর একটি জটিল সমগ্রক’’। সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে একটি জাতি তার ঐতিহ্যের লালিত সেতুবন্ধনে অনায়সে পৌছতে পারে। সংস্কৃতির মৌলিকত্বকে বাদ দিয়ে সুন্দর মনের পরিপূর্ণ মানুষ হওয়া একেবারেই অসম্ভব কারণ সংস্কৃতি মৌলিক ও দেশীয় দুটো ধারার সংমিশ্রণ, তবে দেশীয় সংস্কৃতি কখনো মৌলিক ধারাকে বাধাগ্রস্থ বা আঘাত করে না দেশীয় সংস্কৃতি গড়ে ওঠে মৌলিকত্বকে কেন্দ্র করে আর এ মৌলিকত্বের অনুকূলে দেশের আবহমান প্রকৃতি-পরিবেশ ও ইতিহাস ঐতিহ্যেরে ধারাকে সমুন্নত রেখে গড়ে ওঠে দেশীয় সংস্কৃতি। যে দেশের সাংস্কৃতিক বলয় যত শক্তিশালী সে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাস ও চেতনার মৌলিক নির্যাসে গড়া সংস্কৃতি তত বেশি প্রাণোজ্জ্বল ও সক্রিয় । মৌলিক সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র দেশীয় সংস্কৃতি চর্চা ও ধারণ পানিবিহীন নৌকার মত অকার্যকর। মৌলিক সংস্কৃতির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে সুস্থ সংস্কৃতি- সুন্দর মানুষ, যার সুদূরপ্রসারী ভিশন হচ্ছে সুস্থ সংস্কৃতির নান্দনিক বিকাশ ও নৈতিকতা সমৃদ্ধ সমাজ । অথচ সাম্প্রতিক কালে আমাদের এই মৌলিক আত্মা ও জাতীয় সংস্কৃতিকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করা হচ্ছে। প্রায় বিলুপ্তির ঝুঁকিতে সাংস্কৃতিক নিদর্শন সমূহ ও আবহমান প্রকৃতির গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের চিন্তা-বিশ্বাস, সুখ-দুঃখের মধ্যে গড়ে ওঠা সুস্থ-সংস্কৃতির চারণভূমি এ বাংলা। সংস্কৃতির মৌলিকত্বকে বাদ দিয়ে যারা শুধুমাত্র সৌন্দর্য ও ভোগের সংস্কৃতিকে লালন পালন করতে আগ্রহী তারাই মূলত গৌরবের জাতীয় সংস্কৃতিতে বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটায় । বিজাতীয় সংস্কৃতি প্রথমে সংস্কৃতির ছদ্ধাবরণে সুই হয়ে প্রবেশ করে পরবর্তীতে সবকিছু ধ্বংস করে ফাল হয়ে বেরিয়ে যায়। সংস্কৃতি মানুষের অন্তর্গত প্রেরণা ও আচরণের বিষয় । কিন্তু বিজাতীয় সংস্কৃতি যদি একবার মানুষের মনমগজে সাদামাঠা সমীকরণে প্রোথিত হয়ে যায় তাহলে মানুষ সেই সংস্কৃতিতেই নিজের আপন অস্তিত্ব খুঁজে বেড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টায় ব্রত হয়। এতে করে সে পথ হারা হয়। নিজস্ব প্রকৃতি, চিন্তা ও বিশ্বাসের বিপরীত রীতিনীতি সংস্কৃতির সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার কারণে বিশ্বাসের জায়গায় মারাত্মক ভ্রম তৈরী হয়। যে ভ্রম তার আসল পরিচয় তুলে নেবে। হয়ে যাবে শেকড়বিহীন ভাসমান কচুরিপানার মতো । যখন বাতাস যেদিকে নিয়ে যাবে সেদিকে যাবে, তার নিজস্ব কোন গতিপথ বা ঠিকানা থাকবে না। সাংস্কৃতিক দেউলিয়ার কারণে আজ আমরা সব হারাতে বসেছি। বারবার যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে তারা সকলেই দেশীয় সংস্কৃতি ও মূলধারাকে পৃষ্ঠপোষকতা করার পরিবর্তে ধার করা ভিনদেশীয় সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কিছুদিন পূর্বে জাতীয় দৈনিকের বিনোদন পাতাগুলোতে বিশ্বখ্যাত কানাডিয়ান পূর্নো স্টার সানি লিউন বাংলাদেশের মাটিতে সংস্কৃতির নতুন রুপ নিয়ে আগমনের বার্তা ছাপানো হয়েছে, তার সাথে থাকছে আরো একঝাঁক ভারতীয় নগ্ন-অর্ধনগ্ন তারকা, এ খবরটা মূলধারার সংস্কৃতিবানদের হতবাক করেছে । এসব তারকা বাংঙ্গালীদের দেশীয় সংস্কৃতির জন্য গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেলেও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা আমরা পাইনি । ইংরেজ ও ভিনদেশীয় সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে বাঙ্গালীরা আপন অস্তিত্ব খুঁজে নেয়ার হীন অপচেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে মূলধারার সংস্কৃতিবানদের উপর গুরু দায়িত্ব হয়ে পড়েছে জনসচেতনার মাধ্যমে সংস্কৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতা দূর করে জনমানুষের নিকট দেশীয় সংস্কৃতির আসল রুপরেখা তুলে ধরা। কিছু স্বার্থন্বেষী মানুষের হীন চক্রান্তে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নৈরাজ্য ও বিশৃংখলা চলছে। এ নৈরাজ্য ও বিশৃংখলার সরাসরি ইন্দন জোগাচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী বৃহৎ শক্তি । শক্তিমানদের এসব বিকৃত ও আগ্রাসন যেহেতু ষড়যন্ত্রমূলক সেহেতু এর বিরুদ্ধে একটি প্রতিকার মূলক ব্যবস্থা গ্রহন এখন সময়ের অনিবার্য দাবি।
–লেখক, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাংবাদিক
ই-মেইল:[email protected]